সিরিয়া বিপ্লবের অন্তিম সময়ের ভেতর বাহির
সিরিয়া বিপ্লবের শেষ ধাপে বিদ্রোহীদের সর্বশেষ অভিযান নিয়ে আল জাযিরা দুর্দান্ত একটা ডকুমেন্টারি প্রকাশ করেছে।
বাহ্যত বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে সিরিয়ানরা মূলত ত্রিমাত্রিক জগতে বসবাস করত। যার একদিকে ছিল ইদলিব এবং এখানে থাকা বিদ্রোহীরা।
সারা সিরিয়া থেকে ধরে এনে এখানে তাদের জড়ো করা হয়েছিল। কোনো সরকার নাই, হাসপাতাল নাই, কৃষি নাই, চাকরিবাকরি নাই, এমনকি জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংস্থার সহায়তাও নাই।
২০১৮ তে বিদ্রোহীরা আহমদ আল শারার নেতৃত্বে একটা সরকার প্রতিষ্ঠা করে। সেই সরকারের মূল কাজগুলোর একটা ছিল তরুণদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। সিভিল ডিফেন্স, হোয়াইট হেলমেট নামে তারা মূলত জনসেবা ও উদ্ধার তৎপরতা চালাইত।
এর বাইরে শিক্ষাব্যবস্থা বলতে ছিল সামরিক প্রশিক্ষণ। বহু বহু সামরিক কোর্স প্রোভাইড করত। বেসিক থেকে শুরু করে স্নাইপিং পর্যন্ত নানা ধরনের কোর্স করত তরুণরা।
এই তরুণরা পুরো সিরিয়ার সবচেয়ে বিদ্রোহী অংশ। প্রতি সন্ধ্যায় ইদলিবের মোড়ে মোড়ে আসর বসত। বিপ্লবের গান, কবিতা আর স্মৃতিচারণই ছিল তাদের সঙ্গী।
তাদের একেকজন নিজ নিজ পরিবারের ১০-২০ জন করে কবরে শুইয়ে তারপর শুন্য হাতে সবুজ গাড়িতে চড়ে ইদলিবে এসেছে।
তাদের অনেকেই বিশ্বাস করত—দরকার হলে ২০ টা বিপ্লব হবে। কিন্তু কসাই আসাদ পরিবারের কবল থেকে সিরিয়া মুক্ত হবেই।
ফলে ইদবিলে গড়ে উঠেছে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, নিবেদিতপ্রাণ ও প্রশিক্ষিত হাজার হাজার তরুণের ঝাঁক। যাদের অনেকেই দশ-বারো বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিল। আর ফেরা হয়নি।
প্রায় প্রতিদিনই ইদলিবের কোথাও না কোথাও রাশিয়া-সিরিয়ার জেটগুলো বোম্বিং করে যাচ্ছে। এর ভিতরেই ইদলিববাসী টিকে ছিল।
সিরিয়ান ওয়ার্ল্ডের আরেক প্রান্তে ছিল আসাদ সরকার আর তার স্যাঙ্গাতরা। সরকারি টিভিতে ২৪ ঘণ্টা প্রোপাগান্ডা চলমান।
দামেস্কবাসী অদ্ভূতভাবে সেগুলোকেই সত্য মনে করত। তারা মনে করত পুরো সিরিয়া আসাদের কব্জায় চলে এসেছে। বিদ্রোহীরা হারিয়ে গেছে। সিরিয়া বেশ ভাল চলছে।
ইদলিব, আলেপ্পো, হামার পর বিদ্রোহীরা যখন হোমসে আক্রমণ করে, বিদ্রোহীদের ধারণা ছিল এখানে তীব্র লড়াই হবে। কারণ আলেপ্পো আর হামা থেকে সরে এসে সরকারি বাহিনির সমস্ত শক্তি তখন হোমসে। কিন্তু মাত্র এক বিকেলে বিদ্রোহিরা শহরটি দখল করে নেয়।
বিকেলে আক্রমণ শুরু হয়, মাঝরাতে শহরের আকাশ আলোকিত হয়ে উঠে বিজয়ের আতশবাজি আর গুলির ঝলকানিতে।
ঠিক একই সময়ে আসাদের টিভি ‘সম্প্রচার’ করছিল—বিদ্রোহিদেরকে ড্রোন হামলার মাধ্যমে হোমস থেকে হটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি হামা, আলেপ্পো পার হয়ে সরকার এখন ইদলিব বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে!
একদিকে বিদ্রোহিরা যখন আলেপ্পো পার হয়ে গেছে, অন্যান্য শহরে তখন সিরিয়ান আর্মির পলায়ন শুরু হয়ে গেছে। সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পরে যায়। জুনিয়রদেরকে জরুরি ভিত্তিতে ডেকে পাঠানো হয়।
কিন্তু কী করতে হবে, তার কোনো নির্দেশনা না দিয়েই সিনিয়ররা সব পালিয়ে যায়।
জুনিয়ররা একে তো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছিল। তার উপর সরকারি সেনাদের অনেকেই ‘আসাদবিরোধী’! এমনকি অন্যান্য সৈনিকরাও জানত কারা করা আসাদবিরোধী!!
সেনাসংখ্যার বিপুল সঙ্কটের কারণে আসাদ বাধ্যতামূলক সেনাশ্রম নিত। এক তাদের মধ্যে অনেকেই এমন ছিল—যার এক ভাই দীর্ঘদিন সেনাবাহিনিতে থাকার পরও ছুটি না পাওয়ার কারণে আরেক ভাই সেনাবাহিনিতে ঢুকেছে। যেন বড়ভাই একটু ছুটি পায়।
দুইবছরের চুক্তিতে ঢুকানো হলেও দশক পার হয়ে গেছে, কিন্তু চুক্তি আর শেষ হয়নি।
এই ধরনের সৈনিকরা সবাই বসে বসে দিন গুণত কবে, কখন, বিদ্রোহীরা আসবে। সিরিয়া আসাদমুক্ত হবে। আর তারা ফিরে যাবে ঘরে। নিছক খেয়েপরে বেঁচে থাকার জন্য সেনাবাহিনিতে এসে জীবন হারাতে হবে না।
সিরিয়ান ওয়ার্ল্ডের তৃতীয় মাত্রায় ছিল খা খা শুন্য, বিরান জনবসতি। যেগুলো একসময় প্রাণচাঞ্চল্য আর প্রাণোচ্ছলতায় ভরপুর ছিল। সমৃদ্ধ নগর ছিল।
কিন্তু সারিন গ্যাস, তারপর দীর্ঘ অর্ধযুগের অবরোধ, অতপর পুতিন-আসাদের পোড়ামাটিনীতির বোম্বিং, অবশেষে সবুজ গাড়িতে করে ইদলিবে নির্বাসনের ফলে সেসব ঐতিহ্যবাহী শহর-নগর ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়।
পুরো শহরজুড়ে কবরের নিস্তব্ধতা, ধ্বংস, গণকবর আর সুনসান নিরবতা। অথচ এসব শহর-নগরের বাসিন্দারা নিজ ঘরে ফেরার জন্য, একটু নিজের ভিটেমাটি ছুঁয়ে দেখার জন্য সিরিয়ারই আরেকপ্রান্তে চাতকের মত অপেক্ষমান।
বিদ্রোহীরা দামেস্কে প্রবেশ করেছে শান্তিপূর্ণভাবে। কোনো রক্তপাত হয়নি। এমনকি আলাওয়িদেরও জীবন ও সম্পদ নিরাপদ ছিল।
এক মহিলা পালিয়ে গিয়েছিল। তার ভাই যায়নি। সপ্তাহখানেক পর ভাইকে ফোন করে জানতে পারে শহরে কোনো লুটপাট, জ্বালাও-পোড়াও হয়নি। অবাক হয়ে ফিরে এসে সে নিজের ঘর যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সেভাবেই পেয়েছে।
এক্ষেত্রে শারার দর্শন হল—এনাফ ইজ এনাফ। সিরিয়ায় প্রতিশোধ, ধ্বংস, লুটতরাজ, হত্যাকাণ্ড যথেষ্ট হয়েছে। এখন থামতে হবে। পরিচয় যাই হোক, যে জনগোষ্ঠিরই হোক, সিরিয়ানদের এখন নিরাপত্তা দরকার, স্থিতি দরকার।
পুরো ডকুমেন্টারিটা আমি দেখেছি মূলত শারার পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে কোনো হেল্প হয় কিনা, সেজন্য।
বিদ্রোহীদের দামেস্ক দখলের আক্রমণ কোনো রিএকশন বা প্রতিক্রিয়া ছিল না। আসাদ বাহিনি ক্রমাগত ইদলিবে বিমান হামলা চালিয়ে গেলেও শারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি, নিজের প্ল্যান থেকে সরে আসে নি।
দাঁত কামড়ে তরুণদের প্রশিক্ষণ চালিয়ে গেছে আর সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিল।
যখন আলেপ্পো পার হয়ে হামার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, পুতিন-আসাদ মরণ কামড় দেয়। ইদলিব, আলেপ্পো আর হামায় নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে বিমান হামলা চালাতে থাকে।
কিন্তু শারা এসব হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তার প্ল্যানে কোনো পরিবর্তন আনেন নি। তার বাহিনি নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর হামার পতনের পরই তারা খোজ পাচ্ছিল দামেস্কের। সেখানে যে পলায়নের ধুম পড়ে গেছে, সব খবরই তাদের নিকট ছিল।
ফলে, শারা ক্ষমতায় আসার পর এক শ্রেণির রাজনীতি ‘বিশেষ+অজ্ঞ’ ইজরাইলের ক্রমাগত বিমান হামলার মুখে শারা কেন কিছু করছে না, এ নিয়ে হা হুতাশে মত্ত ছিল। সিরিয়ার সেই সক্ষমতা নাই, এটা সবাই-ই জানে।
বাট পাশাপাশি শারার নিজস্ব স্টাইলও এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। যে কারণে ইজরাইল অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত।
সিরিয়া-ইজরাইল সম্পর্ক কেমন হবে, দুইয়ের মাঝে টানাপোড়েন কেমন চলবে, তা সময়ই বলে দিবে।
তবে সিরিয়ার প্রতিশোধ হিসেবে গ্রিস-সাইপ্রাসকে ঘিরে তুরস্কের উপর ইজরাইলের যে চাপ ও উত্তেজনা তৈরির কৌশল, তার বিপরীতে ঠাণ্ডা মাথার শারা+এরদোয়ান জুটি কী চাল দেয়, তা একটা দেখার মত ইভেন্ট হবে হোপফুলি।
